ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায়: ৯৩০ খ্রিস্টাব্দের মক্কা গণহত্যা ও কাবা লুণ্ঠন
প্রস্তাবনা:
ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু ঘটনা থাকে যা পড়লে আজও শিউরে উঠতে হয়। আজ থেকে প্রায় ১১০০ বছর আগে, ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে (৩১৭ হিজরি) পবিত্র মক্কা নগরী এবং কাবা শরীফ সাক্ষী হয়েছিল এক চরম নৃশংসতার, যা মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে আজও এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। এটি এমন এক সময় ছিল যখন রাজনীতির আড়ালে ধর্মকে ব্যবহার করে এক পৈশাচিক উন্মাদনা চালানো হয়েছিল।
সেই অভিশপ্ত দিন ও ভয়াবহতা:
সে বছর ৮ই জিলহজ, যখন সারাবিশ্বের হাজীরা পবিত্র হজের ইহরাম বেঁধে মিনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখন বাহরাইন থেকে আসা চরমপন্থী কারমাতিয়ান (Qarmatian) গোষ্ঠীর নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবি তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অতর্কিতে মক্কায় আক্রমণ করে।
তারা পবিত্র হারাম শরীফের ভেতরে ঢুকে তলোয়ার চালিয়ে হাজার হাজার নিরীহ হাজীকে হত্যা করে। এমনকি যারা জীবন বাঁচাতে কাবার গিলাফ ধরে আর্তনাদ করছিলেন, তাদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। ইতিহাসবিদদের মতে, সেদিন প্রায় ৩০,০০০ হাজীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, কারমাতিয়ানরা অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে নিহতদের মরদেহ পবিত্র জমজম কূপের ভেতর নিক্ষেপ করে কূপটিকে অপবিত্র ও ভরাট করে দেয়।
হাজরে আসওয়াদ চুরি ও অবমাননা:
নৃশংসতার এখানেই শেষ ছিল না। আবু তাহির দাম্ভিকতার সাথে ঘোষণা করেন যে, এই পাথর (হাজরে আসওয়াদ) মানুষের ইবাদতের বস্তু নয়। সে তার গদা দিয়ে আঘাত করে পবিত্র হাজরে আসওয়াদ পাথরটি কাবা শরীফ থেকে উপড়ে ফেলে এবং লুণ্ঠিত মালামালের সাথে তা বাহরাইনে নিয়ে যায়। টানা ২২ বছর (৯৩০-৯৫২ খ্রি.) কাবা শরীফ এই পবিত্র পাথরটি ছাড়াই ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, পাথরটি চুরি করলে মানুষ মক্কার পরিবর্তে বাহরাইনে তাদের তৈরি করা গির্জায় হজ করতে যাবে।
আবু তাহির আল-জান্নাবি: এক অভিশপ্ত পরিচয়:
আবু তাহির আল-জান্নাবি ছিল কারমাতিয়ান নামক একটি চরমপন্থী শিয়া ইসমাইলি উপদলের প্রধান। যদিও সে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিত, কিন্তু তার বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ড ছিল ইসলামের মূল চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। সে হজ পালনকে 'মূর্তিপূজা' ও 'মূর্খতা' বলে উপহাস করত। তার শাসনকাল ছিল ত্রাস ও ধ্বংসের প্রতীক। ৯৩১ সালে সে এক পারস্য যুবককে 'মাহদি' ঘোষণা করে ইসলামি প্রতীকগুলো ধ্বংস করার চেষ্টাও করেছিল, যা তাকে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
শেষ কথা ও শিক্ষা:
এই ঘটনাটি কেবল রাজনৈতিক কোনো যুদ্ধ ছিল না, এটি ছিল ধর্মের নামে চরমপন্থা ও উন্মাদনার এক বীভৎস রূপ। শেষ পর্যন্ত ৯৫২ খ্রিস্টাব্দে কারমাতিয়ানরা বিশাল মুক্তিপণের বিনিময়ে পাথরটি ফেরত দিতে বাধ্য হয়। ইসলামের ইতিহাসে আবু তাহির আজ এক ঘৃণিত ও অভিশপ্ত নাম হিসেবেই পরিচিত। ৯৩০ সালের সেই রক্তস্নাত মক্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, উগ্রবাদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন