সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রুকইয়া বিক্রি করা বনাম বিনিময় গ্রহণ

 


রুকইয়া বিক্রি করা বনাম বিনিময় গ্রহণ


সহিহ হাদিসের মানদণ্ড এবং ইসলামের মূলনীতির আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক:

## ১. রুকইয়া বিক্রি করা বনাম বিনিময় গ্রহণ

সহিহ বুখারির একটি দীর্ঘ হাদিসে (হাদিস নং: ২২৭৬/৫৭৩৬) দেখা যায়, আবু সাঈদ খুদরি (রা.) জনৈক ব্যক্তিকে সূরা ফাতিহা পড়ে ঝাড়ফুঁক করেছিলেন এবং বিনিময়ে এক পাল বকরি নিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বিনিময় গ্রহণকে বৈধ বলেছিলেন। 

তবে বর্তমান সময়ে '৫ লিটার পানি ৪ হাজার টাকা',প্রথম সেশনে ১০ হাজার টাকা —এই ধরণের উচ্চমূল্য নির্ধারণ এবং এটিকে ব্যবসায়িক রূপ দেওয়া ইসলামের মূল মেজাজের পরিপন্থী। আলেমদের মতে, এটি অসহায় মানুষের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে এক ধরণের শোষণ, যা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। 

## ২. অনেক বোতলে একসাথে ফুঁ দেওয়া

পদ্ধতিগতভাবে, রুকইয়ার মূল বিষয় হলো তিলাওয়াতকারীর মুখ থেকে বের হওয়া বাতাস (নাফাস) বা হালকা থুতুমিশ্রিত ফুঁ সরাসরি আক্রান্ত বস্তুর (পানি বা শরীর) ওপর পড়া।


* সহিহ হাদিসের মূলনীতি: রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন রুকইয়া করতেন, তখন তিনি নির্দিষ্ট পাত্রে বা ব্যক্তির ওপর ফুঁ দিতেন। 

* একসাথে শত শত বোতল সামনে রেখে একবার সূরা পড়ে সবার ওপর ফুঁ দেওয়াকে অনেক মুহাদ্দিস ও রুকইয়া বিশেষজ্ঞগণ 'দুর্বল পদ্ধতি' মনে করেন। কারণ এতে প্রতিটি বোতলে সরাসরি 'নাফাস' পৌঁছায় না, যা রুকইয়ার প্রভাবকে কমিয়ে দেয়। এটি অনেকটা রুকইয়াকে 'যান্ত্রিক' বা 'ফ্যাক্টরি প্রোডাকশন'-এর মতো বানিয়ে ফেলার শামিল। 


## ৩. সহিহ সমাধান: নিজে পড়া শ্রেষ্ঠ

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, রুকইয়া কোনো তুকতাক বা জাদুর কাঠি নয়। এটি আল্লাহর কাছে করা একটি আর্তনাদ বা দোয়া।


* হাদিসের শিক্ষা: সহিহ বুখারিতে (৫৭৪৮) আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুল (সা.) নিজেই নিজের ওপর সূরা পড়ে ফুঁ দিতেন। 

* অন্যের ওপর নির্ভর না করে আপনি নিজেই আপনার পানির বোতলে সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং শেষ ৩টি সূরা পড়ে ফুঁ দিয়ে নিন। এটিই সুন্নাহর সবচেয়ে কাছাকাছি এবং এতে কোনো টাকাও খরচ হয় না।


সারকথা: হাজার টাকা দিয়ে পানি কেনা কোনো সহিহ হাদিস দ্বারা নির্দেশিত নয়। বরং এটি এক শ্রেণির মানুষের বাণিজ্যিক অপকৌশল। রুকইয়া মূলত একটি ইবাদত ও দোয়া, যা নিজের জন্য নিজে করাই সবচেয়ে কার্যকর ও সুন্নাহসম্মত।


রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও সহিহ হাদিসের আলোকে পানির ওপর রুকইয়া (দম করা) বা পানি পড়ার বিষয়টি নিচে দলিলসহ দেওয়া হলো:

## ১. পানিতে দমের সরাসরি দলিল (সুনানে আবু দাউদ)

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত একটি হাদিসে সরাসরি পানির পাত্রে দম করার উল্লেখ পাওয়া যায়:


হাদিস: রাসূলুল্লাহ (সা.) সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর কাছে গেলেন যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। তখন রাসূল (সা.) বললেন, "হে মানুষের রব! সাবিত ইবনে কায়েসের কষ্ট দূর করে দিন।" এরপর তিনি বাতহান (মদিনার একটি উপত্যকা) থেকে কিছু মাটি নিলেন এবং একটি পাত্রে পানি নিয়ে তাতে ফুঁ দিলেন (نفث - Nafth) এবং সেই পানি তার ওপর ঢেলে দিলেন।

(সূত্র: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৩৮৮৫। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি ও অন্যান্য অনেক মুহাদ্দিস এই হাদিসের সনদকে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন) 


## ২. রুকইয়ার পদ্ধতিতে 'নাফাস' বা ফুঁ দেওয়ার নিয়ম (সহিহ বুখারি)

পানির ওপর পড়ার সময় 'নাফাস' (সামান্য থুতুমিশ্রিত ফুঁ) দেওয়ার পদ্ধতি সহিহ বুখারি থেকে প্রমাণিত:


হাদিস: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন অসুস্থ হতেন, তখন তিনি নিজের ওপর 'মুয়াব্বিযাত' (সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস) পড়ে ফুঁ দিতেন।

(সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৭৪৮) 

আলেমদের মতে, এই একই পদ্ধতিতে পানির ওপর ফুঁ দেওয়া জায়েজ, কারণ রুকইয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কালামের বরকত আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া।


## ৩. সাধারণ মূলনীতি (সহিহ মুসলিম)

রুকইয়া বা ঝাড়ফুঁকের যেকোনো পদ্ধতি যা শিরকমুক্ত, তা সহিহ হাদিসে অনুমোদিত:


হাদিস: আউফ ইবনে মালিক আশজাঈ (রা.) বলেন, আমরা জাহেলি যুগে ঝাড়ফুঁক করতাম। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ বিষয়ে আপনি কী বলেন? তিনি বললেন, "তোমাদের রুকইয়াগুলো (পদ্ধতিগুলো) আমার কাছে পেশ করো। যতক্ষণ তাতে শিরক না থাকে, ততক্ষণ রুকইয়া করাতে কোনো সমস্যা নেই।"

(সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২০৮) 


## সারসংক্ষেপ (সহিহ হাদিস অনুযায়ী আমল):

১. একটি পরিষ্কার পাত্রে পানি নিন।

২. সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি এবং সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করুন (এগুলো সহিহ হাদিসে বর্ণিত শ্রেষ্ঠ রুকইয়া)।

৩. পড়ার মাঝে বা শেষে পানিতে সামান্য থুতুমিশ্রিত হালকা ফুঁ (Nafth) দিন।

৪. এই পানি পান করুন অথবা শরীরে ব্যবহার করুন।

ভন্ড রাক্বী কবিরাজ তান্ত্রিক থেকে দূরে থাকুন, সুস্থ থাকুন,শিরক মুক্ত থাকুন।সহিহ হাদিস ও কুরআন অর্থ বুঝে পড়ুন,আমল করুন ইনশাআল্লাহ।

© 2026 Shorna Abedin. All rights reserved.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সবথেকে পৈশাচিক নির্যাতনের জাদু : Sihr al-Falak

  "গবেষক হিসেবে আমি অনেক অদৃশ্য শক্তির মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু আমি কল্পনাও করিনি যে একদিন আমি নিজেই 'সিহরুল ফালাক' বা আহ্নিক গতির এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি হব। একজন রিসার্চার যখন নিজেই সাবজেক্ট হয়ে যায়, তখন জগতটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।" "আমার মস্তিস্ক বলছিল এটি আহ্নিক গতির সাথে সিনক্রোনাইজ করা একটি জাদুকরী লুপ, কিন্তু আমার শরীর সেই যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। নিজের ওপর রুকইয়াহ করা বা এই চক্র ভাঙার লড়াইটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।" By Shorna Abedin Paranormal Researcher & Spiritual Reality Analyst The Invisible Cage: My Encounter with the Magic of Earth’s Rotation রুকইয়াহর পরিভাষায় আহ্নিক গতির জাদু বা 'সিহরুল ফালাক' (Sihr al-Falak) হলো একটি অত্যন্ত জটিল ও উচ্চমাত্রার কালো জাদু। এই জাদুটি সম্পর্কে সচেতনতা এবং এর প্রতিকার নিয়ে একটি গাইডলাইন নিচে দেওয়া হলো: ## আহ্নিক গতির জাদু (Sihr al-Falak): যখন জীবন একটি অভিশপ্ত চক্রে বন্দি হয় আহ্নিক গতির জাদু কী? এটি এমন এক ধরণের জাদু যেখানে জাদুকর ভুক্তভোগীর ভাগ্য, শরীর বা কাজকে পৃথিবীর আহ্নিক গতির (ঘূর্ণন) স...

'সিহরুল ফিনতাজিয়া' (Sihr al-Fantasia) বা 'সিহরুল ইস্তিবদাল' (Replacement Magic)

  নকল অবয়ব তৈরির এই জাদুটি রুকইয়াহর পরিভাষায় অত্যন্ত জটিল ও শক্তিশালী। একে 'সিহরুল ফিনতাজিয়া' (Sihr al-Fantasia) বা 'সিহরুল ইস্তিবদাল' (Replacement Magic) বলা হয়।  ১. নকল অবয়ব তৈরির জাদু কী? এই জাদুতে জাদুকর ভিকটিমের চুল, নখ বা কাপড়ের টুকরো ব্যবহার করে শয়তানি মন্ত্রের মাধ্যমে একটি 'ছায়া সত্তা' (Shadow Self) তৈরি করে। কেন করা হয়: যাতে আসল মানুষটি ঘরের এক কোণে অবশ বা অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে, আর ওই জাদুকরী অবয়বটি তার ভাগ্য, রূপ এবং রিজিক দখল করে নেয়। পরিণতি: এর ফলে মানুষ ভিকটিমকে দেখলে বিরক্ত হয়, কুৎসিত মনে করে বা তার সাথে প্রতারণা করে। কারণ তারা আসল মানুষটিকে নয়, বরং ওই জাদুকরী কালো ছায়া বা 'মিথ্যা অবয়বকে' দেখে।  ২.মুক্তির উপায় (কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী): সূরা বাকারা (The Ultimate Shield):এর আমল। সিদর (বরই পাতা) ও লবণের গোসল:৭টি কাঁচা বরই পাতা পিষে রুকইয়ার পানিতে মিশিয়ে গোসল করলে শরীরের ওপর থাকা জাদুকরী 'আস্তর' বা নকল অবয়বটি খসে পড়ে।  সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির: বিশেষ করে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু..." ১০০ বার পাঠ করা। এটি ...

থানাটোফোবিয়া ও মৃত্যু জাদু।

 #DeathMagic #illness_Magic বিভিন্ন ধরনের কালো জাদু আছে, যার মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হল মৃতের কাফন থেকে তৈরি "মৃত্যু জাদু" এবং "অসুখের জাদু"।এটা মেসোনিক বা ফারাও দের জাদু হিসেবেও পরিচিত। 'থানাটোফোবিয়া' এর মানে আপনার মৃত্যু বা মৃত্যুর ভয় আছে। থানাটোফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের নিজের মৃত্যুকে নিয়ে কিংবা পরিবার এবং বন্ধুদের মৃত্যু বা মৃত্যু প্রক্রিয়ার বিষয়ে ভয় পেতে পারেন।এটা অনেক সময় 'মৃত্যু র জাদু র লক্ষণ প্রকাশ করে। কিছু তথাকথিত অনভিজ্ঞ রাক্বি ক্যান্সারকে কালোজাদু র সাথে মিশিয়ে পাবলিক সেন্টিমেন্ট সৃষ্টি করে অহেতুক ভীতি প্রদর্শন করে। মূলত, ক্যান্সার একটি জৈব প্রক্রিয়ায় সংঘটিত হয়ে থাকে।এটার সাথে জ্বিন বা জাদুর কোন সম্পর্ক নেই। লক্ষণ: ধড়ফড়, বুকের মধ্যে বিষাদ এবং আঁটসাঁটতা, পিঠের নিচের দিকে এবং কাঁধে ব্যথা, রাতে অনিদ্রা, ভয়ের তীব্র আবেগ এবং অস্বাভাবিক ক্রোধ। ঘন ঘন ঝাঁকুনি ও দীর্ঘশ্বাস, বিচ্ছিন্নতার প্রতি ভালোবাসা, অলসতা, ঘুমের ইচ্ছা এবং কোনো চিকিৎসা কারণ ছাড়াই অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা। আইন হাসাদের কারনেও মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।জাবের (রাযিয়া...