মহান আল্লাহ পৃথিবীতে জ্বিন ও মানুষের হিদায়াতের জন্য অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নবী ইবরাহিম (আ.)-কে ইরাকের বাবেল শহরে পাঠান। তিনি তাঁর স্ত্রী সারাহকে নিয়ে ফিলিস্তিনের আল-খলিল নগরীতে চলে যান। সেখানে তাঁর সন্তান ইসহাক (আ.)-এর জন্ম হয়। ইসহাক (আ.)-এর সন্তান ছিলেন ইয়াকুব (আ.)। ইয়াকুব (আ.)-এর আরেক নাম ছিল ইসরায়েল। আর তাঁর সন্তানদের বলা হত বনী ইসরাইল।
মুহাম্মদ (সা.)-এর আবির্ভাবের আগে ইহুদী পণ্ডিতরা জনগণকে তার আগমন সম্পর্কে সুসংবাদ দিতো। তারা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তওরাতে নবীজী সম্পর্কে যেসব নিদর্শনের কথা বলা হয়েছে সেগুলো জনগণের মধ্যে বলে বেড়াতো। কিন্তু সত্যিই সর্বশেষ নবীর আগমন হয় তখন তারা হযরত মুহাম্মদ (সা.)- কে এমনভাবে অস্বীকার করলো যেন তাঁর সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।
মূলত: পদমর্যাদার লোভ অধিকাংশ মানুষের জন্য বিশেষ করে পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্য একটি বিপজ্জনক বিষয়। যখন ইহুদী পণ্ডিতরা মনে করলো যে, তারা মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতের সত্যতা স্বীকার করলে নিজেদের দুনিয়াবী পদমর্যাদা হাতছাড়া হবে, তখন তারা তাঁর নবুয়্যাতকে বেমালুম অস্বীকার করে বসলো। তবে ইহুদীদের মধ্যে যারা সত্যপন্থী এবং সৎ তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে পবিত্র কোরআন বলেছে, অধিকাংশ লোক সত্যকে অস্বীকার করলেও তাদের মধ্যে অল্প সংখ্যক ব্যক্তি সত্য গ্রহণ করেছিল।
হযরত সোলায়মান (আ.) এর যুগে যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্র বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তাই হযরত সোলায়মান (আ.) যাদুকরদের সব কাগজ-পত্র এক জায়গায় জমা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু হযরত সোলায়মানের (আ) পর একদল লোক ওই কাগজ-পত্রের খোঁজ পায় এবং শরু করে যাদু চর্চা। বনী ইসরাইলের কিছু লোক ঐশী গ্রন্থ তওরাত অনুসরণের পরিবর্তে ওই যাদু ও তন্ত্র-মন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আর তারা তাদের এ কাজকে জায়েয করার জন্যে বলে বেড়াতে লাগল যে, এই বই-পত্রতো সোলায়মানের এবং তিনি ছিলেন শক্তিশালী জাদুকর। পবিত্র কোরআনে তাদের এ মিথ্যা দাবির জবাবে মহান আল্লাহ বলেন, সোলায়মান কখনোই জাদুকর ছিলেন না। বরং তিনি হলেন আল্লাহর নবী। তিনি যেসব অলৌকিক নিদর্শন দেখাতেন সেসব ছিল আল্লাহর দেয়া মোজেযা। বরং তোমরা এর মাধ্যমে ওইসব শয়তানের অনুসরণ করছো যারা জাদু চর্চা ছড়িয়ে দিয়েছে।
আল্লাহর নির্দেশে বাবেল শহরে হারুত ও মারুত নামে দুই ফেরেশতা মানুষকে সতর্ক করে দিতো যাতে কেউ যাদু বিদ্যার অপব্যবহার করে নিজেদের বস্তুগত স্বার্থ হাসিল না করে। কিন্তু ইহুদীরা জাদু ও তন্ত্র-মন্ত্র শিখে এর মাধ্যমে নিজেদের অন্যায় স্বার্থ পূরণ করতো। যদিও তারা জানতো যে, যাদুর কাজ কুফরীর শামিল।
পবিত্র কোরআনে ইহুদিদের বিভিন্ন দোষ ও গুণের কথা এসেছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হল
🛑 মহান আল্লাহ ইহুদি জাতিকে তাদের সময়ে শ্রেষ্ঠ জাতি করেছিলেন, তবে তাদের অপরাধপ্রবণতা, ঔদ্ধত্য আচরণ ও অহমিকার কারণে তারা বিরাগভাজন হয় এবং পৃথিবীর সবথেকে নিপীড়িত জাতিতে পরিণত হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'হে বনি ইসরাইল! আমার অনুগ্রহগুলো স্মরণ করো, যা আমি তোমাদের দিয়েছিলাম এবং আমি তোমাদের সারা বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম।' (সূরা: বাকারা, আয়াত: ৪৭)
🛑 বনি ইসরাইল মুমিনদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। পবিত্র কুরআনে মহানবী (সা.)-কে এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলা হয়েছে: 'আপনি মানুষের মধ্যে ইহুদি ও মুশরিকদের সবচেয়ে বেশি শত্রুভাবাপন্ন পাবেন, এবং যারা বলে, আমরা খ্রিস্টান, আপনি তাদের মুমিনদের নিকটতর বন্ধুত্বে দেখবেন...। (সুরা: আল মায়িদা, আয়াত: ৮২)
🛑 কুরআনে বনি ইসরাইলকে ধুরন্ধর ও অর্থলোভী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে: 'আসলে তাদের অন্তরে আল্লাহর থেকে তোমাদের ভয়-ই বেশি। কারণ, তারা নির্বোধ সম্প্রদায়।' (সুরা: হাশর, আয়াত: ১৩)
🛑 সব সময় বিশ্বাস ভঙ্গ করা বনি ইসরাইলের একটি মন্দ স্বভাব। তাই তাদের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে সতর্ক করা হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'তারা যখনই অঙ্গীকার করেছে, তখনই তা ভঙ্গ করেছে; বরং তাদের অধিকাংশই অবিশ্বাসী।' (সূরা: বাকারা, আয়াত: ১০০)
🛑 বনি ইসরাইল সুযোগ পেলেই বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'তারা যতবার যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছে, মহান আল্লাহ ততবার তা নিভিয়েছেন, তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা করে বেড়ায়, আল্লাহ বিশৃঙ্খল ব্যক্তিদের ভালবাসেন না।' (সূরা: আল মায়িদা, আয়াত: ৬৪)
🛑 ইহুদিদের মধ্যে অনন্তকাল বেঁচে থাকার বাসনা প্রবল। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'আপনি জীবনের প্রতি তাদেরকে সব মানুষের মধ্যে, এমনকি মুশরিকদের থেকেও বেশি লোভী পাবেন। তাদের সবাই আকাঙক্ষা করে, যদি তাদের হাজার বছর আয়ু দেওয়া হত। কিন্তু দীর্ঘায়ু তাদের শাস্তি থেকে দূরে রাখতে পারবে না, তারা যা করে আল্লাহ তার দ্রষ্টা।' (সূরা: বাকারা, আয়াত: ৯৬)
🛑 পৃথিবীতে একমাত্র বনি ইসরাইল জাতি আল্লাহকে বারবার দোষারোপ করেছে। কখনও তারা আল্লাহকে দরিদ্র বলে আখ্যায়িত করেছে। যেমন কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন, যারা বলে নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবগ্রস্ত এবং আমরা অভাবমুক্ত, তাদের কথা ও অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করার বিষয়টি আমি লিখে রাখছি। আমি বলব, জ্বলন্ত আযাব ভোগ কোরো। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৮১)
🛑 ইহুদিরা নিজেদেরকে আল্লাহর সন্তান বলে দাবি করে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'ইহুদি ও খ্রিস্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান এবং তাঁর প্রিয়জন। আপনি বলুন, তাহলে তিনি তোমাদের অপরাধের কারণে কেন শাস্তি দেবেন; বরং তোমরা মানুষ...।' (সূরা: মায়িদা, আয়াত: ১৮)
🛑 ইহুদিরা নিজেদেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলে মনে করে এবং অন্যদের নিচু ও অদ্ভুত-অস্পৃশ্য মনে করে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'কিতাবধারীদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে, যার কাছে বিপুল সম্পদ আমানত রাখলেও ফেরত দেবে। আবার এমন লোকও আছে, যার কাছে এক দিনার রাখলেও তার পেছনে লেগে না থাকলে সে তা ফেরত দেবে না। এর কারণ তারা বলে, নিরক্ষরদের ওপর আমাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং তারা জেনেশুনে আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলে।' (সূরা: আলে-ইমরান, আয়াত: ৭৫)
🛑 বনি ইসরাইলের অপকর্মের কারণে মহান আল্লাহ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের চিরস্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত করেন। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'আল্লাহ ও মানুষের প্রতিশ্রুতি ছাড়া তারা যেখানেই ছিল লাঞ্ছিত হয়েছে, তাদের ওপর আল্লাহ ক্রুদ্ধ হয়েছেন এবং তারা অভাবগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, তারা আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করত এবং অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করত, তারা অবাধ্য হয়েছিল এবং সীমালঙ্ঘন করত।' (সূরা: আলেইমরান আয়াত ২২২)
🛑 বনি ইসরাইলের লোকেরা যুগে যুগে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হয়েছে। তারা জালিম শাসকের নিয়ন্ত্রণে থেকে লাঞ্ছনাকর জীবন যাপন করেছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'স্মরণ করুন ওই সময়ের কথা, যখন আপনার রব ঘোষণা করেন যে, তিনি কিয়ামত পর্যন্ত তাদের ওপর এমন লোক পাঠাবেন, যারা তাদের কঠিন শাস্তি দিতে থাকবে। আপনার রব শাস্তি দিতে তৎপর এবং তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' (সূরা: আরাফ, আয়াত: ১৬৭)
🛑 বনি ইসরাইল জাতি বহু নবী-রাসুলকে হত্যা করেছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'যারা আল্লাহর নিদর্শনাবলি অস্বীকার করে, অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করে এবং যারা ওই সব মানুষকে হত্যা করে, যারা ন্যায়বিচারের নির্দেশ দেয়, আপনি তাদের কঠিন শাস্তির সুসংবাদ দিন।' (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ২১)
Shorna Abedin

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন