“কালো পুতুল” (Black Doll) দিয়ে করা Black Magic বা কুশিল্প (سحر) পৃথিবীর বহু অঞ্চলে প্রচলিত এক ভয়ংকর প্রকারের তাবিজ ও প্রতীকভিত্তিক জাদু (symbolic sihr)।
এটি সাধারণত “Voodoo-type Sihr”, “Representation Magic” বা “Puppet Sorcery” নামে পরিচিত।
নিচে এর উৎস, উদ্দেশ্য, কাজের প্রক্রিয়া ও ইসলামিক বিশ্লেষণসহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো—
🌑 ১. উৎস ও ধারণা
“কালো পুতুল” দিয়ে জাদু করার ধারণা এসেছে মূলত:
আফ্রিকান ও ক্যারিবিয়ান Voodoo tradition থেকে;
পরবর্তীতে মিশর, ভারত, ইয়েমেন ও সুদানে জিন ও মন্ত্রের মাধ্যমে এটি ইসলামী জগতে প্রবেশ করে;
আজ এটি “তাসবিহি সিহর” (symbolic imitation) বা “تمثيلي السحر” নামে পরিচিত—যেখানে জাদুকর কোনো মানুষকে প্রতীকী বস্তুর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করে।
⚫ ২. পুতুলের ব্যবহার পদ্ধতি
ধাপ ১: প্রতিনিধিত্ব তৈরি
জাদুকর (বা জাদুকারিণী) প্রথমে আক্রান্ত ব্যক্তির কিছু ব্যক্তিগত জিনিস সংগ্রহ করে—
যেমন:
চুল, নখ, রক্ত, কাপড়ের টুকরো, ছবি, বা নাম
এসবকে সে “নিয়্যত” (intent) সহ এক পুতুলে জড়িয়ে ফেলে যেন এটি ঐ ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করে।
ধাপ ২: পুতুলে রুহানি সংযোগ
এরপর জাদুকর জিন বা শয়তানকে আহ্বান করে, কিছু শয়তানি মন্ত্র (যার মধ্যে কুফরি শব্দ থাকে) পড়ে,
এবং ঐ পুতুলে “spiritual link” স্থাপন করে যাতে পুতুলে যা করা হয়, তা ভুক্তভোগীর উপর ঘটে।
এটি “sihr al-tasweer (magic through imagery)” নামে পরিচিত।
ধাপ ৩: যন্ত্রণা প্রয়োগ
এরপর সে পুতুলে:
সুচ ঢোকে (ব্যথা/রোগের উদ্দেশ্যে)
আগুন লাগায় (অশান্তি ও মানসিক পুড়ন সৃষ্টি করতে)
গলায় দড়ি দেয় (দমবন্ধ বা আত্মহত্যা চিন্তার উদ্দেশ্যে)
কালো কাপড়ে মুড়ে কবর দেয় (আত্মা বেঁধে রাখা বা মৃত্যু ডাকার উদ্দেশ্যে)
৩. ইসলামী ব্যাখ্যা
📖 আল-কুরআন:
> وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ
“হারূত ও মারূত কাউকে জাদু শিক্ষা দিত না, যতক্ষণ না তারা বলত: আমরা কেবল পরীক্ষা; তুমি কুফরি করো না।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১০২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, যে কেউ শয়তানি মাধ্যম ব্যবহার করে অন্যকে ক্ষতি করে, সে কুফর ও শিরকে লিপ্ত হয়।
🕌 সহিহ হাদীস:
"اجتنبوا السبع الموبقات..."
নবী ﷺ বলেন, “সাতটি ধ্বংসকারী পাপ থেকে বাঁচো।”
সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী?
তিনি বললেন: “আল্লাহর সঙ্গে শিরক, জাদু করা...”
(বুখারী ও মুসলিম)
অর্থাৎ, কালো পুতুলের মাধ্যমে জাদু করা শিরকেরই একটি রূপ।
৪. এর প্রভাব
মানসিক চাপ, ভয়, দুঃস্বপ্ন, শরীরে সুচবিদ্ধ অনুভূতি
হঠাৎ বুকে আগুনের মতো জ্বালা, শ্বাসকষ্ট
সম্পর্ক নষ্ট, হঠাৎ ঘৃণা বা ভালোবাসা পরিবর্তন
নামাজে মনোসংযোগ হারানো
আয়, বিবাহ বা সন্তান জন্মে বাধা
এসব লক্ষণ প্রায়শই দেখা যায় sihr at-tasweer বা sihr al-maradh (রোগজনিত জাদু) তে।
৫. চিকিৎসা ও মুক্তির পথ
🔹 ১. আন্তরিক তওবা ও শিরক ত্যাগ
জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারের কাউকে প্রথমেই শিরকীয় বস্তু (তাবিজ, পুতুল, তাবারক) ধ্বংস করতে হবে।
🔹 ২. পূর্ণ রুকইয়াহ শারইয়াহ
সূরা আল-বাকারা (পূর্ণ)
সূরা ইউনুস 81–82
সূরা ত্বাহা 68–70
সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইখলাস
আয়াতুল কুরসি
রোজ সকালে ও রাতে রুকইয়াহ শুনতে হবে এবং পানি, তেল, ও ঘরে ছিটাতে হবে।
🔹 ৩. পুতুল ধ্বংসের নিয়ম
যদি কেউ সেই পুতুল পায়:
1. সেটিকে মাটি বা কবর থেকে উঠিয়ে সুরা ফালাক, নাস, ইখলাস পাঠ করে;
2. আলাদা করে খুলে ফেলে (যদি গিঁট বা সুতো থাকে);
3. তারপর আগুনে পোড়ায় বা নদীতে ছুঁড়ে দেয়;
4. এরপর রুকইয়াহ চালিয়ে যায় যতক্ষণ না লক্ষণ থামে।
🔹 ৪. সুরক্ষা রুটিন
ফজর ও মাগরিবে আযকার নিয়মিত
প্রতি রাতে সূরা বাকারার অন্তত কিছু অংশ
ঘর ও শরীরে কালোজিরা তেল, রুকইয়াহ পানি, ও জমজম পানি প্রয়োগ
তাওহীদের দৃঢ় ধারণা: “لا حول ولا قوة إلا بالله” বারবার পাঠ।
“কালো পুতুলের জাদু” আসলে কেবল বস্তু নয়—এটি রুহের বিরুদ্ধে পরিচালিত এক শয়তানি চুক্তি।
এ থেকে মুক্তি কেবল আল্লাহর কালাম ও বিশুদ্ধ ঈমানের মাধ্যমে সম্ভব।
কারণ কোনো জাদু আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কাজ করে না, আর যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার ওপর শয়তানদের কোনো কর্তৃত্ব থাকে না।
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
“যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে, শয়তানের তাদের উপর কোনো প্রভাব নেই।”
(সূরা النحل ১৬:৯৯)
Shorna Abedin

Comments
Post a Comment