গণক কিভাবে হাত দেখার ছলে যাদু করে?
১. শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে জিনের প্রবেশপথ খোলা:
হাত স্পর্শ করার মাধ্যমে তারা এক প্রকার “ঐন্দ্রজালিক ছোঁয়া” প্রয়োগ করে, যা শরীরের “মারকাজ” বা হিজামার পয়েন্ট ও নাড়ির (pulse) মাধ্যমে কাজ করে। এ সময় তাদের সাথে থাকা জিন স্পর্শের মাধ্যমে শরীরে ঢুকতে পারে।
২. লুকানো কুফরি বাক্য বা চুক্তি পাঠ:
গণকরা অনেক সময় হাত দেখতে দেখতে নিরবে এমন কিছু কুফরি মন্ত্র বা ইবলিসীয় চুক্তির শব্দ উচ্চারণ করে যা সামান্যত বোঝা যায় না। এগুলোর মাধ্যমে তারা গোপনে সেই ব্যক্তির রূহ বা কদর লিখা মুছে দেয় বা আটকে রাখে।
৩. নখ, ঘাম বা চুল সংগ্রহ:
হাত ধরার সময় গোপনে ঘাম, ত্বকের কিছু খোঁচা, বা নখ সংগ্রহ করে যেটা পরবর্তীতে সিহর বা তিলস্মে ব্যবহৃত হয়।
৪. চোখে চোখ রেখে তান্ত্রিক চুম্বক প্রয়োগ:
তারা অনেক সময় চোখের দিকে তাকিয়ে হিপনোটিক ছায়া ফেলে দেয় (নযর/عين)। এতে দুর্বল আত্মা বা ঈমান সম্পন্ন ব্যক্তি তাড়াতাড়ি প্রভাবিত হয়। তারা হিপনোটিক মাধ্যমে রূহানি দরজা খুলে নেয়।
৫. ভবিষ্যদ্বাণীর নামে আত্মাবন্ধন:
তারা বলে— “তোমার জীবনে বড় বিপদ আসবে”, “কেউ তোমার ক্ষতি করতে চায়”, “তোমার বিয়ে হবে না”— এই ভয়ভীতি আসলে এক প্রকার নেগেটিভ আত্মিক চুক্তি। এটা শুনে যদি কেউ ভয় পায় ও বিশ্বাস করে, তখন সেই কথাই তার জীবনে বাস্তব হতে শুরু করে, কেননা সে নিজেই তা অনুমোদন করেছে।
---
❖ এর ফলে কী কী ক্ষতি হয়?
১. আত্মা দুর্বল ও শয়তানের কব্জায় চলে যায়:
এই যাদুর ফলে রূহের আলো ঢেকে যায়। ইবাদতে মন বসে না, কুরআন শুনলে বিরক্তি আসে।
২. জ্বিন দ্বারা অনুসরণ ও সংযুক্তি:
হাত দেখানোর মাধ্যমে তারা অনেক সময় জ্বিন-বন্ধন বা রাকিব জ্বিন নিয়োগ করে। এই জ্বিন সেই ব্যক্তির উপর নজর রাখে, স্বপ্নে আসে, শরীরের মাঝে কষ্ট তৈরি করে।
৩. রিজিক ও ভাগ্য বন্ধ:
যারা বলে “তোমার কপালে বিয়ে নেই”, “তোমার চাকরি হবে না”— আসলে এই ধরনের কথা বলে তারা আল্লাহর লিখিত তাকদিরে হস্তক্ষেপ করে এবং রিজিক বন্ধের যাদু বসিয়ে দেয়।
৪. বিপরীত লিঙ্গের মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি:
গণকদের মাধ্যমে অনেক সময় সিহর আল-তাফরীক (বিচ্ছেদ যাদু) করা হয়, যাতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হয়।
৫. সততা ও আত্মবিশ্বাস হারানো:
তারা বললে, “তুমি দুর্ভাগা”, “তোমার ভিতরে খারাপ শক্তি আছে”— তখন আত্মবিশ্বাস ও Tawakkul বিলীন হয়। মানুষ নিজের ভালো কল্পনাও করতে পারে না।
---
হাত দেখানো ও জ্যোতিষ্যের ছলে যাদু — কুরআন-হাদীস ও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যায় এক ভয়ংকর বাস্তবতা
(সতর্কতামূলক বিশ্লেষণ, ঈমান রক্ষার্থে প্রণীত)
---
অনেকেই বলে, “একটু মজা করে হাত দেখালাম, এ তো আর গোনাহ নয়।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, জ্যোতিষী ও গণকদের ছদ্মবেশে বহু যাদুকর মানুষকে অজান্তে সিহরের শিকার করে — যেমন চুরি করে ঘরে বিষ ঢেলে দেয়। মানুষ টেরও পায় না, তার কপাল, হৃদয়, আত্মা, রিজিক, স্বাস্থ্য কিভাবে আটকে যাচ্ছে।
এটা শুধু ইসলামিকভাবে হারাম নয়— বরং মানসিক, আত্মিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনে।
---
❖ কুরআন দ্বারা সতর্কতা:
📖 ১. সিহর শয়তানী শিক্ষা:
> "আর তারা এমন কিছু শেখে যা স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। অথচ তারা কাউকে কোনরূপ ক্ষতি করতে পারে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া।"
— সূরা আল-বাকারা ২:১০২
🔍 এই আয়াতে “سِحْرٌ” (যাদু) কে নেগেটিভ এনার্জি ও ডিভাইডিং ফোর্স বলা হয়েছে— যা অনুমতি না থাকলে কাজ করে না, কিন্তু কেউ যদি বিশ্বাস করে, ভয় পায় বা গিয়ে সহায়তা চায়, তখন সে নিজের উপর দরজা খুলে দেয়।
---
📖 ২. তাকদির অস্বীকার:
> "তুমি বলো, কেউ আমার কোনো ক্ষতি বা উপকার করতে পারে না, আল্লাহ যা চান তা-ই হবে।"
— সূরা জিন ৭২:২১
🔍 গণকের বলা “তোমার কপাল খারাপ”, “তোমার সামনে অন্ধকার”— এগুলো আসলে আল্লাহর তাওয়াক্কুল ভেঙে দেওয়া। বিশ্বাস করে নিলে ঈমান দুর্বল হয়।
---
📖 ৩. জ্যোতিষ্য ও গায়েব সম্পর্কে দাবি:
> "তোমার রব গায়েব সম্পর্কে সবজান্তা; তিনি কাউকে নিজের গায়েব সম্পর্কে অবহিত করেন না।"
— সূরা জিন ৭২:২৬-২৭
🔍 জ্যোতিষীরা বলে “তোমার আগামী বছর এমন হবে”, “তোমার মৃত্যুর আগে কষ্ট হবে”— এটা স্পষ্ট মিথ্যা ও গায়েবের দাবি। আর যেই গায়েব দাবি করে, সে শয়তান দ্বারা চালিত।
---
❖ হাদীস দ্বারা সতর্কতা:
🕋 রাসূল ﷺ বলেন:
> "যে ব্যক্তি কোন গণকের নিকট যায় এবং তার কথা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ ﷺ এর উপর যা নাযিল হয়েছে তা অস্বীকার করল।"
— সুনান আবু দাউদ, ৩৯০৪ (সহিহ)
🔍 অর্থাৎ হাত দেখিয়ে, গণকের কথা শুনে “তোমার জীবন এমন”, “তোমার দোষ এমন”— এসব শুনে কেউ বিশ্বাস করলে সে কাফেরদের মত আচরণ করল, আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকার করল।
---
> "যে কেউ কোন গণকের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো (বিশ্বাস না করলেও), তার ৪০ দিনের নামায কবুল হয় না।"
— সহিহ মুসলিম, ২২৩০
🔍 এটা প্রমাণ করে— শুধু “শখ করে” বা “জানার কৌতূহলে” গেলেও আমল বাতিল হয়ে যায়। তার দোয়া, সলাত, তাওবা আটকে যায়।
---
❖ আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণ:
🧠 ১. Hypnosis বা মনোবিদ্যার ছায়া ফেলা:
গণকরা চোখে চোখ রেখে কথা বলে এবং ধীরে ধীরে Neuro-Linguistic Programming (NLP) ব্যবহার করে মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট ভাবনা গেঁথে দেয়।
🔬 মনোবিজ্ঞান প্রমাণ করে যে — নেতিবাচক কথা বারবার শুনলে, মানুষ অবচেতনভাবে তা বিশ্বাস করতে শুরু করে (self-fulfilling prophecy)।
➡️ যেমন: “তোমার ভাগ্য খারাপ”— এরকম কথা মানসিকভাবে বিশ্বাস করলে মস্তিষ্কে stress hormones (cortisol) বেড়ে যায়, immune system দুর্বল হয়।
---
⚙️ ২. Bio-energy ও Electromagnetic Disruption:
মানবদেহে bio-electrical প্রবাহ থাকে (যেমন হৃদপিণ্ডে ইসিজি, মস্তিষ্কে EEG)। যাদুকররা হাত স্পর্শ করে এ প্রবাহে disturbance ঘটায়।
🔬 গবেষণায় দেখা গেছে, strong emotional or spiritual impact কায়িক bio-field এর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে — যেমন electromagnetic poisoning।
➡️ গণকের হাত স্পর্শে যদি তার পিছনে থাকা negative spiritual force বা জ্বিন কাজ করে, তখন দেহের নিরাপদ শক্তিপথগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
---
⚠️ ৩. Placebo vs Nocebo Effect:
> 🧪 Placebo: মনে বিশ্বাস জন্মালে ভালো ফল হয়।
🧪 Nocebo: ভয় পেলে ও নেতিবাচক চিন্তা করলে শরীরেও খারাপ প্রভাব পড়ে।
🔍 গণকের কথা মানুষকে Nocebo Effect এ ফেলায়। কেউ বললে, “তোমার দাম্পত্য সুখ হবে না”— সে যদি বিশ্বাস করে, তখন শরীরে হরমোন ব্যালেন্স নষ্ট হয়। তারপর রোগ, হতাশা, বিচ্ছেদ আসতে শুরু করে।
---
❖ বাস্তবিক ক্ষতির তালিকা:
ক্ষতির ধরণ ব্যাখ্যা
🧿 আত্মিক জিন-বন্ধন হাত স্পর্শের মাধ্যমে জিনের সংযুক্তি তৈরি হয়
🩺 শারীরিক দুর্বলতা হজম, হার্ট, চোখ বা ত্বকে সমস্যা শুরু হয়
🧠 মানসিক অবসাদ উদ্বেগ, হতাশা, স্বপ্নে ভয়াবহতা দেখা দেয়
💔 দাম্পত্য সমস্যা সহবাসে অনীহা, সম্পর্ক শুষ্ক হয়ে যায়
📉 রিজিক আটকে যায় জীবনে অগ্রগতি বন্ধ, হঠাৎ চাকরি বা অর্থ হারানো
---
❖ করণীয় (ঈমান রক্ষার পথ):
1. তাওয়াক্কুল ও তাওহীদের চর্চা করুন।
2. সুরা আল-ইখলাস, ফালাক, নাস প্রতিদিন ৩ বার করে সকালে ও রাতে পড়ুন।
3. কখনো কারো সামনে হাত না বাড়ান, যাকে আপনি শারঈভাবে চিনেন না।
4. কোনো দুর্যোগে প্রথমে কুরআনের দিকে যান, গণকের দিকে নয়।
5. "হাত দেখানো", "চোখে চোখ রাখা", বা “কপাল পড়া” এসব যেন আপনার ঘরে প্রবেশ না করে।
---
❖ উপসংহার:
🕯️ হাত দেখানো শুধু নিরীহ খেলা নয়— বরং এক ভয়ানক আত্মিক ফাঁদ। যারা "জানার আগ্রহে" সেখানে যায়, তারা অজান্তেই শয়তানকে ঈমানের চাবি তুলে দেয়। তারা কুরআনের আলো ভুলে শয়তানের আঁধারকে আপন করে।
সুতরাং, আপনাকে বা কাউকে যদি গণক বা পামিস্টের কাছে যেতে দেখে থাকেন, তার হাত ধরে বলুন:
> "তোমার তাকদির, আল্লাহর হাতে — পাথরের দাগে নয়। তোমার ভবিষ্যৎ, সিজদার আলোয় — কপালের রেখায় নয়।"
Shorna Abedin

Comments
Post a Comment