নফস কী?
"نَفْس"
(নফস) শব্দটি আরবি, যার অর্থ আত্মা, সত্তা, বা মন। এটি মানুষকে ভালো ও মন্দ—উভয় দিকেই প্রবৃত্ত করে। ইসলামী পরিভাষায় নফস তিন প্রকার:
1. النَّفْسُ الأَمَّارَةُ بِالسُّوءِ
– মন্দ কাজের নির্দেশদানকারী নফস
2. النَّفْسُ اللَّوَّامَةُ
– নিজেকে ধিক্কার দেওয়া নফস
3. النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ
– প্রশান্ত নফস
প্রথম ধাপে, নফস মানুষের মধ্যে চরম ধ্বংসাত্মক প্রবণতা সৃষ্টি করে। নফসকে সংযত না করলে সে মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যেতে পারে।
---
কুরআনের আলোকে নফসের ক্ষতিকর প্রভাব
🔹 سورة يوسف, آية 53:
> وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي ۚ إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌۭ بِٱلسُّوٓءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّىٓ ۚ إِنَّ رَبِّى غَفُورٌۭ رَّحِيمٌۭ
“আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয়ই নফস তো মন্দের প্রতি খুবই প্ররোচনাদানকারী, তবে যার প্রতি আমার পালনকর্তা দয়া করেন, সে ব্যতিক্রম। নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
(সূরা ইউসুফ: ৫৩)
📌 এই আয়াতে নফসের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে—তা মানুষকে ক্রমাগত মন্দে প্ররোচিত করে।
---
নফসের প্রতারণামূলক কৌশলসমূহ
1. গুনাহকে সুন্দর করে উপস্থাপন:
নফস শয়তানের সহযোগে পাপকে অলংকৃত করে তোলে।
> وَزَيَّنَ لَهُمُ ٱلشَّيْطَـٰنُ أَعْمَـٰلَهُمْ
“শয়তান তাদের কর্মকে তাদের কাছে সুশোভিত করে তোলে।” (সূরা নحل: ৬৩)
2. তাওবা বিলম্বিত করা:
নফস বলে, “আরও কিছুক্ষণ পরে তাওবা করো।” অথচ মৃত্যু এসে যায় হঠাৎ।
3. গুনাহকে ছোট মনে করানো:
হাদীসে এসেছে:
> «إن المؤمن يرى ذنوبه كأنه قاعد تحت جبل يخاف أن يقع عليه، وإن الفاجر يرى ذنوبه كذباب مرّ على أنفه فقال به هكذا»
“একজন মুমিন নিজের গুনাহকে মনে করে যেন সে এক বিশাল পাহাড়ের নিচে বসে আছে যা তার উপর পড়ে যেতে পারে, আর একজন ফাসিক মনে করে যেন তার নাকের ওপর একটা মাছি এসে বসেছে আর সে এটাকে উড়িয়ে দিল।”
(সহীহ বুখারী: ৬৩০৮)
---
নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ: সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মসংগ্রাম
🔹 رسول الله ﷺ বলেন:
> «المجاهد من جاهد نفسه في الله»
“প্রকৃত মুজাহিদ সে, যে আল্লাহর পথে নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে।”
(সুনান তিরমিযী, হাদীস: ১৬২۱, হাসান)
📌 এখানে বোঝানো হয়েছে, বাহ্যিক জিহাদের চেয়েও কঠিন হলো অন্তরের জিহাদ, নফসকে পরাভূত করা।
---
কীভাবে দমন করবো নফসকে?
1. নফল সালাত, রাত্রির কিয়াম:
> تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ ٱلْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًۭا وَطَمَعًۭا
“তাদের পার্শ্ব বিছানা থেকে দূরে থাকে, তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে।”
(সূরা আস-সাজদা: ১৬)
2. রোযা:
রোযা নফসকে ভাঙার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
রাসূল ﷺ বলেন,
> «الصيام جنة»
“রোযা ঢালস্বরূপ।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
3. তাওবা ও ইস্তিগফার:
নফসের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর নিকট শরণাপন্ন হতে হবে।
4. সালেহ পরিবেশে থাকা:
খারাপ বন্ধু, কুপ্রবৃত্তি, অপসংস্কৃতি—সবই নফসকে উসকে দেয়।
উম্মাহর প্রতি এক হৃদয়স্পর্শী আহ্বান
হে মুসলিম ভাই ও বোন, এই নফসই এমন এক শত্রু যা আমাদের হৃদয়ে বসবাস করে। বাহ্যিক শয়তানের থেকে এটি বেশি বিপজ্জনক, কারণ এটি আমাদের অনুভব করায় না যে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। তাই নিজেকে চিনুন, নিজের নফসকে জানুন এবং সে অনুযায়ী আত্মশুদ্ধির পথে আগান।
🔹 আল্লাহ বলেন:
> قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّىٰهَا - وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّىٰهَا
“সে সফল, যে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ, যে তা কলুষিত করেছে।”
(সূরা আশ-শামস: ৯-১০)
নফস ও ক্বারিন জ্বিন এক নয়। এরা আলাদা দুই সত্তা—একটি অন্তর্গত মানবিক প্রবৃত্তি, অপরটি জ্বিন জাতির একজন সঙ্গী, যার কাজ মানুষকে পথভ্রষ্ট করা। নিচে এদের পার্থক্য ও সম্পর্ক কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ব্যাখ্যা করছি।
---
🔹 ১. নফস (النفس):
নফস হচ্ছে মানুষের ভিতরে থাকা প্রবৃত্তি ও আত্মিক তাগিদ—যা ভালো বা মন্দ উভয়ের দিকেই ধাবিত করে।
📖 কুরআনে এসেছে:
> إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌۭ بِٱلسُّوٓءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّىٓ ۚ
"নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের প্রতি তাগিদ দেয়, তবে যার প্রতি আমার রব দয়া করেন, সে ব্যতিক্রম।"
(সূরা ইউসুফ: ৫৩)
🧠 নফস মানুষের ভেতরের নিজস্ব "self" বা "ego"। এটা জৈবিক চাহিদা, অহংকার, লোভ, হিংসা ইত্যাদি আবেগের উত্স।
---
🔹 ২. ক্বারিন (القرين):
ক্বারিন হল সেই বিশেষ জ্বিন, যাকে প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে জন্ম থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সঙ্গী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। সে মানুষকে সবসময় মন্দের দিকে টানে।
📖 কুরআনে বলা হয়েছে:
> قَالَ قَرِينُهُۥ رَبَّنَا مَآ أَطْغَيْتُهُ وَلَٰكِن كَانَ فِى ضَلَـٰلٍۢ بَعِيدٍۢ
"তার সঙ্গী (ক্বারিন) বলবে, 'হে আমাদের রব! আমি তাকে বিপথগামী করিনি; সে নিজেই ছিলো ভ্রান্তিতে।'"
(সূরা ক্বাফ: ২৭)
📜 হাদীসে এসেছে:
রাসূল ﷺ বলেন:
> «ما منكم من أحد إلا وقد وُكِّل به قرينه من الجن»
“তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার সাথে এক ক্বারিন (জ্বিন) নিযুক্ত করা হয়নি।”
সাহাবিরা বললেন, "আপনার সাথেও, হে আল্লাহর রাসূল?"
তিনি বললেন:
«نعم، ولكن الله أعانني عليه فأسلم، فلا يأمرني إلا بخير»
“হ্যাঁ, কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং সে আমাকে কেবল ভালো কাজেই উৎসাহ দেয়।”
(সহীহ মুসলিম: ২৮১৪)
---
🔍 নফস ও ক্বারিন: সম্পর্ক ও পার্থক্য
বিষয় নফস ক্বারিন
উৎস অন্তর্গত মানবিক প্রবৃত্তি বাইরের জ্বিন
প্রকৃতি আত্মিক ও মানসিক প্রবণতা অদৃশ্য জ্বিনসত্তা
কাজ মন্দে প্ররোচনা (যদি শুদ্ধ না করা হয়) সবসময় মন্দে টেনে নিয়ে যায়
দমন বা নিয়ন্ত্রণ আত্মশুদ্ধি ও তাযকিয়াহ দ্বারা সম্ভব রুকইয়াহ, যিকর, ও তাকওয়ার মাধ্যমে দুর্বল করা যায়
রাসূল ﷺ এর নফস ছিলো সবচেয়ে পরিশুদ্ধ ক্বারিন ইসলাম গ্রহণ করেছিল
---
🛡️ দু’টির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কিভাবে করবো?
1. নফসের জন্য:
তাওবা, ইস্তিগফার
নফল রোযা ও কিয়ামুল লাইল
ইলম ও তাকওয়া অর্জন
খারাপ পরিবেশ এড়িয়ে চলা
2. ক্বারিনের জন্য:
নিয়মিত যিকর, সকাল-সন্ধ্যার দুআ
আয়াতুল কুরসী ও সূরা আল-ফালাক, সূরা আন-নাস
রুকইয়াহ এর কুরআন এর আয়াত পড়া ও শোনার অভ্যাস
---
নফস আমাদের অন্তরের যুদ্ধ, আর ক্বারিন হলো সেই শত্রু যে বাহির থেকে ফিসফিস করে আমাদের দুর্বলতাকে ব্যবহার করে। উভয় শত্রুর মোকাবেলা করতে হলে চাই দ্বিমুখী প্রতিরোধ—আত্মশুদ্ধি ও যিকরের অস্ত্র। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা আমাদের সকলকে নফস ও ক্বারিনের ফাঁদ থেকে রক্ষা করুন। آمين.
Shorna Abedin

Comments
Post a Comment