আরবিতে প্রবাদ আছে: 'লি-কুল্লে ফেরআউনা মুসা' অর্থাৎ প্রত্যেক জালেম অত্যাচারী ফেরাউনকে শায়েস্তা করার জন্য একজন মুসা থাকে।
সূরা ত্বা-হা:৬৬
মুসা বললেন, বরং তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তাদের জাদু-প্রভাবে হঠাৎ মুসার মনে হল তাদের দড়ি ও লাঠিগুলো ছুটোছুটি করছে। (১)
(১) এ থেকে জানা যায় যে, ফিরআউনী জাদুকরদের জাদু ছিল এক প্রকার নযরবন্দী, যা মেসমেরিজমের মাধ্যমেও সম্পন্ন হয়ে যায়। লাঠি ও দড়িগুলো দর্শকদের দৃষ্টিতেই নযরবন্দীর কারণে সাপরূপে দৃষ্টিগোচর হয়েছে; প্রকৃতপক্ষে এগুলো সাপ হয়নি। অধিকাংশ জাদু এরূপই হয়ে থাকে। [ইবন কাসীর]
[1] মূসা (আঃ) তাদেরকে প্রথমে নিজেদের খেলা দেখাতে বললেন, যাতে এটা তাদের নিকট পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, জাদুকরের এতবড় একটি দল যাদেরকে ফিরআউন একত্রিত করে নিয়ে এসেছে তাদেরকে এবং অনুরূপ তাদের জাদুর নৈপুণ্যে ও ভেল্কিবাজিতে তিনি ভীত নন। দ্বিতীয়তঃ ওদের জাদুর ভেল্কি যখন আল্লাহর মু'জিযার সামনে চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তখন এর একটি সুন্দর প্রতিক্রিয়া হবে এবং জাদুকররা ভাবতে বাধ্য হবে যে, এটা জাদু নয়; বরং সত্যই তিনি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত। নচেৎ ক্ষণিকের মধ্যে তাঁর একটি লাঠি আমাদের সমস্ত ভেল্কির জিনিসকে গিলে ফেলল কিভাবে?
[2] কুরআনের শব্দাবলী দ্বারা জানা যায় যে, দড়ি ও লাঠিগুলো সত্য সত্যই সাপ হয়ে যায়নি। বরং তা জাদুর প্রভাবে এ রকম মনে হচ্ছিল। যেমন সম্মোহন বিদ্যা বা ইন্দ্রজালের সাহায্যে চোখে ধাঁধা বা ভেল্কি লাগিয়ে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও এর প্রভাব অবশ্যই হয়ে থাকে যে, সাময়িক ও অস্থায়ীভাবে দর্শকদেরকে অভিভূত করে ফেলে। যদিও সেই জিনিসের বাস্তবতায় কোন পরিবর্তন ঘটে না। দ্বিতীয় কথা এই জানা গেল যে, জাদু যত বড়ই হোক না কেন জিনিসের আসলত্ব বা প্রকৃততত্ব বদলাতে পারে না।
সূরা ত্বা-হা:৬৭
তখন মুসা তার অন্তরে কিছু ভীতি অনুভব করলেন। (১)
(১) মনে হচ্ছে, যখনই মূসার মুখ থেকে "নিক্ষেপ করো” শব্দ বের হয়েছে তখনই জাদুকররা অকস্মাৎ নিজেদের লাঠিসোটা ও দড়িদাড়াগুলো তাঁর দিকে নিক্ষেপ করে দিয়েছে এবং হঠাৎই তাঁর চোখে ভেসে উঠেছে যেন শত শত সাপ কিলবিল করতে করতে তাঁর দিকে দৌড়ে চলে আসছে। [ইবন কাসীর] এ দৃশ্য দেখে মুসা আলাইহিস সালাম তাৎক্ষণিকভাবে এ আশংকা করলেন যে, মু'জিযার সাথে এতটা সাদৃশ্যপূর্ণ দৃশ্য দেখে জনসাধারণ নিশ্চয়ই বিভ্রাটে পড়ে যাবে এবং তাদের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। [ইবন কাসীর]
সূরা ত্বা-হা:৬৮
আমি বললাম, 'ভয় করো না; নিশ্চয় তুমিই প্রবল। [1]
[1] এই বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে মূসা (আঃ)-এর মনে ভয়ের সঞ্চার হল। আর তা ছিল প্রকৃতিগত স্বাভাবিক ব্যাপার; যা নবুঅত ও ত্রুটিহীনতার পরিপন্থী নয়। কারণ, নবী একজন মানুষই হয়ে থাকেন; যিনি মানবীয় স্বাভাবিক আচরণের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেন না। এখান হতে এ কথা বুঝা যায় যে, যেমন নবীগণ অন্যান্য মানুষের মত বিপদগ্রস্ত হন, তেমনি তাঁরা জাদুর প্রভাবে প্রভাবিতও হতে পারেন। যেমন নবী (সাঃ)-এর উপর ইয়াহুদীরা জাদু করেছিল এবং তার প্রভাব তিনিও অনুভব করেছিলেন। এতে নবুঅতের কাজ প্রভাবিত হয় না। আল্লাহ তাআলা নবীকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিয়ে থাকেন এবং জাদুর ফলে অহী ও রিসালতের কর্তব্য আদায়ে প্রভাব পড়তে দেন না। তাছাড়া এটাও হতে পারে যে, মূসা (আঃ)- এর এই ভয় হল যে, আমার লাঠি ফেলার আগে আগেই জনগণ যেন জাদু ও ভেল্কিবাজি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যায়। কিন্তু অধিকতর সম্ভাবনায় তাঁর ভয় এই কারণে হয়েছিল যে, জাদুকররা যে ভেল্কি দেখাল তা লাঠির দ্বারা।
আর তাঁর হাতেও ছিল লাঠি, যা মাটিতে ফেলার অপেক্ষায় ছিলেন। মূসা (আঃ)-এর মনে হল যে, দর্শকরা যেন সন্দেহ ও সংশয়ে না পড়ে যায় এবং তারা যেন এটা ভেবে না নেয় যে, দু'দলই একই ধরনের জাদু প্রদর্শন করল। এই জন্য এ ফায়সালা ও নির্ণয় কিভাবে সম্ভব যে, কোনটা জাদু এবং কোনটা মু'জিযা? কে বিজয়ী এবং কে পরাজিত? অর্থাৎ, জাদুও মু'জিযার মধ্যে পার্থক্য সাধনের যে উদ্দেশ্য, সেটা বোধ হয় উপর্যুক্ত কারণে সম্ভব হবে না। এখান হতে বুঝা গেল যে, নবীর নিজ হতে মু'জিযা দেখানো তো অনেক দূরের কথা, অধিকাংশ সময়ে তাঁর এটাও জানা থাকে না যে, তাঁর হাত দ্বারা কোন্ শ্রেণীর মু'জিযা প্রকাশ পাবে। নবীদের হাতে মু'জিযা প্রকাশ করার কাজ একমাত্র আল্লাহর। যাই হোক, মূসা (আঃ)-এর এই সন্দেহ ও সংশয় দূর করে মহান আল্লাহ বললেন, 'হে মূসা! কোন প্রকার ভয় ও ভীতির কারণ নেই, তুমিই বিজয়ী হবে।' এই বাক্য দ্বারা প্রকৃতিগত ভয় এবং অন্যান্য আশংকা সবই দূর করে দিলেন।
বস্তুতঃ আল্লাহ্ তা'আলা সর্বযুগেই নবী- রাসূলগণের মু'জিযাসমূহকে এমনি ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন যে, দর্শকবৃন্দ যদি সামান্যও চিন্তা করে আর হঠকারীতা অবলম্বন না করে তাহলে মু'জিযা ও জাদুর মাঝে যে পার্থক্য তা নিজেরাই বুঝতে পারে। জাদুকররা সাধারণতঃ অপবিত্রতা ও পঙ্কিলতার মধ্যে ডুবে থাকে। পঙ্কিলতা ও অপবিত্রতা যত বেশী হবে তাদের জাদুও তত বেশী কার্যকর হবে। পক্ষান্তরে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা হল নবী-রাসূলগণের সহজাত অভ্যাস। তাছাড়া মু'জিযা সরাসরি আল্লাহ্ তা'আলার কুদরাতের কাজ। তাই কুরআনুল কারীমে এ বিষয়টিকে আল্লাহ্ তা'আলার সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
যেমন-
فَلَمۡ تَقۡتُلُوۡهُمۡ وَ لٰکِنَّ اللّٰهَ قَتَلَهُمۡ ۪ وَ مَا رَمَیۡتَ اِذۡ رَمَیۡتَ وَ لٰکِنَّ اللّٰهَ رَمٰی ۚ وَ لِیُبۡلِیَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡهُ بَلَآءً حَسَنًا ؕ اِنَّ اللّٰهَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
সুতরাং তোমরা তাদেরকে হত্যা করনি বরং আল্লাহই তাদেরকে হত্যা করেছেন। আর তুমি নিক্ষেপ করনি যখন তুমি নিক্ষেপ করেছিলে; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছেন* এবং যাতে তিনি তাঁর পক্ষ থেকে মুমিনদেরকে পরীক্ষা করেন উত্তম পরীক্ষা। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
[সূরা আল- আনফাল: ১৭]
সারমর্ম এই যে, ফিরআউনের সম্প্রদায়ও মূসা আলাইহিস সালামের মু'জিযাকে নিজেদের জাদুকরদের কার্যকলাপ থেকে কিছুটা স্বতন্ত্রই মনে করেছিল। সেজন্যই একথা বলতে বাধ্য হয়েছিল যে, এ তো বড় বিজ্ঞ জাদুকর, সাধারণ জাদুকররা যে এমন কাজ দেখাতে পারে না।
মু'জিযা দেখে ঈমান আনার পরিবর্তে ফিরআউনী সম্প্রদায়ের প্রধানেরা তা যাদু বলে আখ্যায়িত করে বলল, 'মুসা তো একজন সুদক্ষ যাদুকর। তার উদ্দেশ্য, এর দ্বারা তোমাদের রাজত্ব শেষ করে দেওয়া।' কারণ মূসা (আঃ)-এর যুগে যাদু ছিল প্রবল এবং তার প্রচলন ছিল সাধারণ। যার ফলে মু'জিযাকেও তারা যাদু ভেবে বসল; যে মু'জিযাতে মানুষের কোন হাত থাকে না, বরং তা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় প্রকাশ পায়। তা সত্ত্বেও ফিরআউনের প্রধানেরা মূসা (আঃ)-এর ব্যাপারে ফিরআউনকে পথভ্রষ্ট করার সুযোগ পেয়ে গেল।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। কুরআন যদি নিয়মিত আবৃত্তি করা না হতো, অর্থ বুঝে আমল করা না হতো তাহলে ইহুদি জাদুকররা সকলকেই গাধায় পরিণত করে দিতো। এখানে গাধা শব্দটি রুপক অর্থে। কুরআন মানুষের চিন্তাশক্তিকে উন্নত করে। কিন্তু জাদুকররা মানুষের সেই চিন্তাশক্তিকে নষ্ট করে দেয়, তখন শয়তানের দল যা বোঝায় মানুষ তাকেই তার লক্ষ্য বানিয়ে ফেলে।
একজন জাদুগ্রস্ত ব্যক্তি যা দেখে তা সাধারণ মানুষ দেখে না,কারন জাদু মিথ্যা।জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে জাদুকর mind game খেলে। আপনার মনকে দুর্বল করে আপনার মস্তিষ্ক নিয়ে খেলাই ওদের আসল উদ্দেশ্য।
জাদুকররা ততদিন আপনাকে নিয়ে খেলবে যতদিন আপনি ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকবেন কিন্তু যেদিন থেকে আপনি আল কুরআনকে ওদের বিপক্ষে আপনার প্রধান হাতিয়ার বানাবেন সেদিন ওদের সবকিছু আপনার কাছে একটা তুচ্ছ তেলাপোকা র মতন মনে হবে যা অকারণে আপনার জীবনে ছোটাছুটি করছে।আর আপনি তখন ইচ্ছে করলেই ঐ তেলাপোকাকে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে পারবেন।
মূসা (আ) এর লাঠি একটা সাধারণ লাঠির মতোই ছিল। কিন্তু সেটা তখনই অসাধারণ হয়ে ওঠে যখন আল্লাহ ইচ্ছা করলেন মানুষকে তার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্বের সম্পর্কে ধারণা দিতে। তেমনি জাদুকর এর জাদু তুচ্ছ, মিথ্যা কিন্তু জাদু থেকে আপনার আরোগ্য লাভ সত্য,এটা আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে।
Shorna Abedin

Comments
Post a Comment