সুলায়মান (আ) এর আংটি চুরি ও রাজত্ব হরণ:
وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُو الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ
ইহুদীরা (তওরাত অনুসরণের পরিবর্তে) সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়তান যা আবৃত্তি করতো তার অনুসরণ করতো। অথচ সুলায়মান (আ) কখনো যাদু করেননি এবং সত্য প্রত্যাখ্যান করেননি। কিন্তু শয়তান মানুষকে জাদু শিক্ষা দিতো এবং যারা এটা করতো তারা কাফের হয়ে গিয়েছিল।
ইহুদীরা বলতো,সুলায়মান (আ)-এর সিংহাসনের নীচে তারা সুলেমান এর সকল জাদুর রহস্য দাফন করেছিল তাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার প্রাক্কালে। কিন্তু সুলেমান (আ) জাদুকর ছিলেন না, তিনি ছিলেন আল্লাহ র একনিষ্ঠ বান্দা। তাঁর সিংহাসনের নীচে কোন জাদুও কেউ লুকিয়ে রাখেনি। তাছাড়া তাঁর রাজত্ব ছিনিয়ে নেবার মত কোন অঘটন ঘটেনি এবং এমন কোন খবরও আল্লাহ বা তাঁর রাসূল (স) আমাদেরকে দেননি। এগুলি নবীগণের মর্যাদার বরখেলাফ এবং স্রেফ ইস্রাঈলী কল্পকাহিনী মাত্র।
সুলায়মান (আঃ)-এর অতুলনীয় সাম্রাজ্যে ঈর্ষান্বিত শয়তানেরা সর্বত্র রটিয়ে দেয় যে, জিন-ইনসান ও পশু-পক্ষী সবার উপরে সুলায়মানের একাধিপত্যের মূল কারণ হ'ল তাঁর পঠিত কিছু কালেমা, যার কিছু কিছু আমরা জানি। যারা এগুলি শিখবে ও তার উপরে আমল করবে, তারাও অনুরূপ ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। তখন লোকেরা ঐসব জাদু বিদ্যা শিখতে ঝুঁকে পড়ল ও তাদের অনুসারী হ'ল এবং কুফরী করতে শুরু করল।
বর্ণিত আয়াতে এর প্রতিবাদ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, সুলায়মান জাদুর বলে নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতা বলে রাজ্য শাসন করতেন।ইহুদী কাফের শয়তানরা মানুষদের ভেতরে কালো জাদু ছড়িয়ে দিতে সুলেমান (আ) নিয়ে মিথ্যাচার করতো।
وَلَقَدْ فَتَنَّا سُلَيْمَنَ وَالْقَيْنَا عَلَى كُرْسِيِّهِ
جَسَدًا ثُمَّ أَنَابَ
আমি সুলাইমানকে পরীক্ষা করলাম এবং তার আসনের উপর রাখলাম একটি দেহ; অতঃপর সুলাইমান আমার অভিমুখী হল। [1]
(আল কুরআন)
[1] এই পরীক্ষা কি ছিল, সিংহাসনে রাখা নিষ্প্রাণ দেহটি কিসের ছিল? তা সিংহাসনে রাখার অর্থ কি? এসব বিবরণ কুরআন পাকে বা কোন সহীহ হাদীসে বিদ্যমান নেই। তবে কোন কোন তফসীরবিদ সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত একটি ঘটনাকে আলোচ্য আয়াতের তফসীর বলে সাব্যস্ত করেছেন। ঘটনার সারমর্ম হল যে, একবার সুলাইমান (আঃ) স্বীয় মনোভাব ব্যক্ত করলেন যে, আজ রাত্রে আমি আমার (৭০ বা ৯০ জন) সকল স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করব যাতে প্রত্যেকের গর্ভ থেকে এক একটি সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে, যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। কিন্তু এ মনোভাব ব্যক্ত করার সময় তিনি 'ইনশাআল্লাহ' বলতে ভুলে গেলেন। (অর্থাৎ তিনি নিজ তদবীরের উপর পূর্ণ ভরসা করে বসলেন।) যাতে ফল এই দাঁড়ালো যে, স্ত্রীগণের মধ্যে মাত্র একজন গর্ভবতী হলেন এবং তাঁর গর্ভ থেকে একটি মৃত ও অসম্পূর্ণ সন্তান ভূমিষ্ঠ হল।
নবী (সাঃ) বলেছেন, "যদি সুলাইমান (আঃ) 'ইনশাআল্লাহ' বলতেন, তাহলে তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর গর্ভ থেকে (তাঁর আশানুরূপ এক একটি) মুজাহিদ সন্তান ভূমিষ্ঠ হত।” (বুখারী, মুসলিম) এই সকল তফসীরবিদদের মতে সম্ভবতঃ 'ইনশাআল্লাহ' না বলা বা শুধু নিজ তদবীরের উপর ভরসা করাটাই ফিতনা বা পরীক্ষা ছিল, যে ফিতনায় সুলাইমান (আঃ)-কে ফেলা হয়েছিল। আর সিংহাসনের উপর নিক্ষিপ্ত দেহ ঐ অসম্পূর্ণ বাচ্চা। আর আল্লাহই ভালো জানেন।
(1) এখানে 'ধড়' বলে কি বোঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে দু'টি মত রয়েছে। এক. এখানে ধড় বলে একটি অপূর্ণাঙ্গ সন্তান বোঝানো হয়েছে। কারণ, সুলাইমান আলাইহিস সালাম শপথ করে বলেছিলেন, আমি আমার স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলে প্রত্যেকেই একটি সন্তান নিয়ে আসবে, যাতে করে তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে পারে, কিন্তু তিনি ইনশাল্লাহ বলতে ভুলে গিয়েছিলেন, তারপর তিনি তার স্ত্রীদের সাথে সহবাস করলেন, কিন্তু তাদের মধ্যে কেবল একজনই একটি অপূর্ণাঙ্গ সন্তানের জন্ম দিল। তারপর সুলাইমান আলাইহিস সালাম তার রবের দিকে ফিরে আসলেন এবং তাওবাহ করলেন। [মুয়াস্সার] দুই. এখানে ধড় বলে সে জিনকে বোঝানো হয়েছে যে সুলাইমান আলাইহিস সালামের অবর্তমানে তার সিংহাসনে আরোহন করেছিল এবং কিছুদিন রাজ্য শাসন করেছিল। তারপর সুলাইমান আলাইহিস সালাম আল্লাহর দিকে ফিরে গেলেন এবং তাওবাহ করলেন। [সা'দী]
সুলায়মান (আঃ)-কে আল্লাহ পরীক্ষা করেছিলেন এবং সে পরীক্ষার ফলে তিনি আল্লাহর দিকে অধিকতর রুজু হয়েছিলেন। কুরআন মাজীদে এই ঘটনা আমাদেরকে শুনানোর উদ্দেশ্য হ'ল যাতে আমরাও কোন পরীক্ষায় নিপতিত হ'লে দিশেহারা না হয়ে যেন আল্লাহর দিকে অধিকতর রুজু ও বিনীত হই- একথা বুঝানো। এখানে মূল ঘটনা বর্ণনা করা আল্লাহর উদ্দেশ্য নয়। তার কোন প্রয়োজনও নেই এবং তার জানার যথার্থ কোন উপায়ও আমাদের কাছে নেই।
এ সম্পর্কে মাননীয় তাফসীরকার যে আংটির ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাছাড়াও তাঁর আংটি শয়তানের করায়ত্ত হওয়া, ৪০দিন পরে তা মাছের পেট থেকে উদ্ধার করে পুনরায় সিংহাসন ফিরে পাওয়া ইত্যাদি গল্পকে হাফেয ইবনু কাছীর স্রেফ ইস্রাঈলী উপকথা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অতএব,আমরা যেন এইসব গল্প বিশ্বাস করে শয়তানের কাছে আত্না বিক্রি না করি। সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ র, তিনি যাকে ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন। সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি রাতকে দিনের মাঝে এবং দিনকে রাতের মাঝে প্রবেশ করান।
Shorna Abedin

Comments
Post a Comment